প্রিন্ট এর তারিখঃ 2026-03-29 11:51:03

বাবা কথার মানে


আমার বাবার অতি সাধারণ জীবন যাপঙ্করতেন। যেমন কমদামি কাপড়ের পায়জামা,পাঞ্জাবি ছেঁড়া চপ্পল,বড় অপরিষ্কার চুল দাড়ি ছিল তাঁর অঙ্গসাজ।তাই তাকে নিয়ে স্কুলে সহপাঠীদের কাছে আমাকে অনেক কটুক্তি,বিদ্রুপ,অবজ্ঞা অবহেলা শুনতে হতো। আমার সহপাঠীদের বাবা মায়েরা অনেক দামী সুন্দর জামা কাপড় পরে। গাড়ি নিয়ে তাদের ছেলে মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসে,আবার নিয়ে যায়।তাদের ছেলে মেয়েরাও দামি দামি পোশাক পরে স্কুলে আসে।তারা প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ভালো ভালো টিফিন নিয়ে আসে।আমিও কমদামি কাপড়ের পোশাক পরে স্কুলে যেতাম।আমার মা তার হাতে বানানো রুটি সবজি,অথবা একটু গুড় এই ছিল আমার টিফিনের খাবার। আমার বাবা একটি কোম্পানির ডি গ্রুপের কর্মচারী।তার সাজ পোশাক বলতে একটি পাঞ্জাবী আর একটি পাজামা, পায়ে একজোড়া ছেঁড়া ,সেলাই করা চপ্পল। এমনকি একটি সাইকেলও ছিল না তার।রোজ পায়ে হেঁটে অফিসে যাওয়া,আসা করতেন। বাবার ঐ একটি পাঞ্জাবি, একটি পায়জামা সব সময় নোংরাই থাকতো। সপ্তাহের শেষে রবিবারে কাপড় কম দামি সাবান দিয়ে নিজে হাতে সেই পায়জামা পাঞ্জাবি পরিষ্কার করতেন, আর ছেঁড়া চপ্পল নিজেই লোহার তার দিয়ে সেলাই করে নিতেন। আমি এবং মা বারবার দুজনে মিলে বাবাকে নতুন জামা পায়জামা পাঞ্জাবি এবং নতুন জুতো কেনার কথা বলতাম। বাবা বার বারই বিভিন্ন কথা বলে এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আমারও পড়ার বই খাতা পত্র সব সময় মতো এনে দিতেন।প্রতিদিনই প্রায় বাবা আমাকে একটিই কথা বলতেন, ভালো করে পড়াশোনা কর বাবা, পড়াশোনা করে অনেক বড় হবি, আমাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করবি । এখন কষ্টকরে পড়াশুনা কর, পরে দেখবি, সারা জীবন সুখে থাকবি। আর সময় করে বেশী বেশী বিভিন্ন ধরনের বই পড়বি। নজরুল,আবুল কালাম,ঈশ্বরচন্দ্র,রবিঠাকুর এইসব মানুষের জীবনী পড়বি। রামকৃষ্ণ,স্বামী বিবেকানন্দ,এবং এমন মনীষীদের বাণী,খুব বেশি করে পড়বি।তাঁদের কথা বেশি পড়লে তুই আদর্শবান ভালো মানুষ হতে পারবি।স্কুলের শিক্ষা তোকে জীবন নির্বাহের জ্ঞান দিয়ে তোকে খুব বড় করে তুলবে।আর মহান মনীষীদের কথা পড়ে আদর্শ মানুষ হবার জ্ঞান অর্জন করবি।ভালো মানুষ হবি। বাবা আমাকে ভীষণ আদর করতেন, অফিস থেকে বাড়ি এলেই আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বসিয়ে পড়ার কথা জিজ্ঞেস করতেন। আমি বেশি সময় বাবার কাছে থাকতাম না, কারণ বাবার শরীর দিয়ে নোংরা ঘামের দুর্গন্ধ হতো, তাই তার কাছে গেলেও দূরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আরও কাছে ডাকলে বিভিন্ন কথা বলে চটপট চলে আসতাম। এসে মায়ের কাছে অভিযোগ করতাম বাবা কেন শরীরে ভালো করে সাবান দিয়ে স্নান করে না ?প্রতি দিন নিয়ম করে চুল দাড়ি কাটতেন না। এবং সেলাই করা চপ্পল পরিবর্তন করতেন না।এসব নিয়ে স্কুলেও আমাকে আমার সহপাঠীদের কাছে অনেক বিদ্রুপ শুনতে হয়।আমি বুঝি, ওরা আমাকে ঘৃণা করে। কেমন যেন সবাই দূরে দূরে থাকে। কেউ আমার বন্ধু হতে চায় না। এসব কথা শুনে মা আমাকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, বাবাকে নিয়ে ওসব বলতে নেই। অন্যদের বাবার অনেক রোজগার আছে, তাদের টাকার অভাব নেই, তাই ওরা ভালো জামা কাপড় পরে, ভালো টিফিন নিয়ে আসে। তোর বাবার সামান্য রোজগার সেই দিয়ে দেখ তোকে পড়াশোনা করাচ্ছে, সংসার চালাচ্ছে। আমাদের অসুখ হলে কেমন অস্থির হয়ে তাড়াতাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে যান,চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তুই অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে বাবাকে ঘৃণা করবি না।বাবাকে অবজ্ঞা করবি না। বাবা যা বলেন মন দিয়ে শুনবি। আর পড়াশোনা করে বড় হয়ে ভালো চাকরি করে বাবাকে তখন আর চাকরি করতে পাঠাবি না। নতুন নতুন জামা কাপড় কিনে দিবি। তখন মায়ের সব কথা আমি বুঝতাম না,বুঝতেও চাইতাম না।এসব কারণে বাবার প্রতি আমার অবজ্ঞা অবহেলা দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সত্যি সত্যি বাবা খুব অযোগ্য অপদার্থ । বর্তমান সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মত মানসিকতা ,ইচ্ছা,যোগ্যতা কিছুই তার নেই। বাবা বাড়িতে থাকলে খুব বেশি কথাবার্তা বলতেন না।যা প্রয়োজনীয় কথা থাকতো তা সব মায়ের সঙ্গে নীচু স্বরে বলতেন। ঘরে বসে শুয়ে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন।আর সময়ে মতো নিয়মিত অফিসে যেতেন। আবার অফিস থেকে এসে আমাকে কাছে ডাকতেন, পড়ার কথা জিজ্ঞাসা করতেন। তারপর একটু চা খেয়ে ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। আমি খুব বিরক্ত হয়ে মায়ের সঙ্গে অভিমান করতাম, কান্নাকাটি করতাম। সবার ঘরে রেডিও টিভি থাকলেও আমাদের ঘরে টিভি নেই কেন এসব নিয়ে আমার খুব মন খারাপ হতো। কেঁদে কেঁদে মায়ের কাছে নালিশ করতাম। কোনদিন বাবার সঙ্গে কোন মেলা, উৎসবে বেড়াতে যেতে চাইতাম না। বাবার সেই পায়জামা পাঞ্জাবি ছেঁড়া চটি আর শরীরের দুর্গন্ধ নিত্য সঙ্গী ছিল।তবুও কখনও মেলায় গেলেও দু চার টাকার খেলনা জিনিস কিনে দিতেন।সামান্য কিছু তেলে ভাজা কিনে দিতেন। তাতে আমার মন ভরতো না।পাশেই বন্ধুদের বাবা-মাদের দেখতাম, তাদের কত সুন্দর জামাকাপড় ,জুতো পায়ে,কত বড় বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে দামী দামী খাবার খায়। আর আমায় দু চার টাকার তেলে ভাজা খেয়ে বাড়িতে ফিরতে হতো। বাড়িতে ফিরে এসে রাগে-অভিমানে ক্ষোভে মাকে বকাবকি করে, না খেয়ে বিছানার এক কোণে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে থাকতাম আর কাঁদতাম। মা আমার মনের কথা সব বুঝতে পারতেন। তিনি আমাকে আদর করে অভিমান ভাঙিয়ে খাওয়াতেন। কাছে নিয়ে আদর করেবলতেন,বাবার উপর ওভাবে রাগ করতে নেই বাবা।অন্যের বাবাদের মত তো তোর বাবার রোজগার নেই, ভালো জামা কাপড় কেনার, ভালো খাবার খেতে দামি রেস্টুরেন্টে যাবার মত সামর্থ নেই। তুই পড়াশোনা শিখে চাকরি করবি, তখন তুই ভালো জামা কাপড় পড়বি, ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে যাবি।এভাবে তুই রাগ করলে তোর বাবা মনে ভীষণ কষ্ট পাবে।আমি শুধু কাঁদতাম আর কিছু বলতাম না। আমি বাবার প্রতি অভিমান,বন্ধুদের অবজ্ঞা অবহেলা আমার মনে প্রচন্ড জেদ চেপে যায়। মনে খুব জেদ নিয়ে পড়াশোনা করি। মাধ্যমিকে জেলার মধ্যে প্রথম হলাম। আমাকে দেখতে, অভিনন্দন,শুভেচ্ছা জানাতে আমার স্কুলের স্যারেরা, দিদিমণিরা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমাকে আদর করয়েছেন। এছাড়া পাড়ার অনেক লোকজন এসে অভিনন্দন জানিয়েছেন।সাংবাদিকরা আমার ছবি তুলে নিয়ে খবরের কাগজে ছাপিয়েছেন। কিন্তু এসবের মধ্যে মা ছাড়া বাবা কখনোই সবার সামনে এসে দাঁড়াতেন না। কথা বলতেন না। কাজের অজুহাতে বাড়ির বাইরেই থাকবেন। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, দেখ খোকা, তোর এমন ভালো রেজাল্টের জন্য তোর বাবার খুব আনন্দ, গর্ব করেন।কিন্তু সবার থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। কারণ নোংরা জামা কাপড়, শরীরের গন্ধ নিয়ে সবার সামনে এলে,সবাই খারাপ পাবে,তাতে তোর ও খারাপ লাগতো,লজ্জা,অপমান মনে করবি।যাতে তোর এই আনন্দের দিনে কষ্ট, মন খারাপ না হয়, তাই তিনি কাজের কথার অজুহাত দেখিয়ে দূরে চলে যেতেন। বাবাকে অবহেলা করবি না। তোর নিজের চেষ্টা এবং তোর বাবার আশীর্বাদ, উপদেশমেনে ভালো করে পড়াশুনা করে তুই আজকে ভালো রেজাল্ট করেছিস। তোর কি মনে হয় না আজ যারা ভাল জামা কাপড় পড়ে স্কুলে যায়, তাদের চেয়ে তুই সাধারণ জামা কাপড় পরে, নিজে নিজেই পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করেছিস, এটা কি তোর গর্ব নয়? এটা কি তোর ওদের চেয়ে বড় পাওনা নয়? আমি তখন মায়ের কথা বুঝতাম,ভাবতাম হয়তো ঠিক তাই। বাবার এই জীবনযাত্রা আমাকে অভিমানি করে হয়তো পড়াশোনার প্রতি অনুরাগ বাড়িয়েছে, তাই আমি ভালো ফল করেছি।তারপর স্কুলের শিক্ষক দিদিমনিদের সাহায্যে আমি উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করলাম। শুধু তাই নয় জয়েন্টে পাস করে ডাক্তারি পাড়ার সুযোগ পেলাম। আমার সংসারে অবস্থা এবং আমার উচ্চ মেধা দেখে বিভিন্ন ক্লাব ,সেচ্ছাসেবী সংগঠন আমার পড়াশোনার সব খরচের দায়িত্ব নিলেন।   এদিকে ধীরে ধীরে বাবার শরীর ভীষণ খারাপ যাচ্ছিল। প্রতিদিন জ্বর,পায়ের ব্যথায় খুব যন্ত্রণা, কষ্ট অনুভব করতেন। একদিন মা বাবাকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। তারপর অনেক কিছু পরীক্ষা করে সব রিপোর্ট নিয়ে আবার ডাক্তারের কাছে গেলেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরেই বাবা- মা একদম চুপচাপ হয়ে গেল।আমি অসুখের কথা জিজ্ঞেস করলে মা শুধু মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলতেন,তোর বাবার পায়ের ঘা বেড়েছে। আমি মায়ের কথা বিশ্বাস করে আর কিছু বলতাম না। কিন্তু কয়েকদিন পর থেকে বাবা আর অফিসে যেতেন না। যেতেও পারতেন না।শরীর খারাপ নিয়ে চুপ চাপ ঘরে শুয়ে থাকতেন।মাঝে মাঝে অফিসের লোকজন এসে বাবাকে দেখে যেতন। তাঁরা মায়ের হাতে টাকা তুলে দিতেন।বাবাকে দেখতে একদিন কোম্পানির বড় সাহেব গাড়ি করে আমাদের বাড়িতে এলেন । সেদিন আমি অবাক হলাম, ভাবলাম,ভালো জামা কাপড় পড়া শিক্ষিত বাবুরা ও খুব ভালো মনের হয়।ঘরে এসেই বাবার দু হাত জড়িয়ে ধরে বাচ্চা মানুষের মতো কাঁদতে লাগলেন।বাবাও খুব কাঁদলেন। বড় সাহেব রুমালে চোখের জল মুছে বলেন,আগে কেন আপনার অসুখের কথা আমাদের বলেন নি?জানলে অনেক আগেই আপনাকে ভালো চিকিৎসার জন্যে ভালো হাসপাতালে নিয়ে যেতাম। আপনি আমাদের কর্মচারী নন,আপনি আমাদের পরিবারের এক জন সদস্য।বাবার সময় থেকে আপনি নিজের মতো করে অফিসের সব দায়িত্ব পালন করেছেন।ছোট কোম্পানি আজ অনেক বড় হয়েছে আপনার পরামর্শ, দায়িত্ব বোধ,কর্ম নিষ্ঠার জন্য।আমরাতো আপনার ছোট ভাই।আপনার থেকে আমরা দায়িত্ববোধ,সততা,নিষ্ঠা,উদারতা ,সবাইকে ভালো বাসতে শিখেছি।বৃদ্ধ বাবা আপনার সব কথা শুনে আমাদের পাঠিয়ে দিলেন।এই বলে,অনেক গুলিটাকা,জামাকাপড়,অনেক বিভিন্ন ধরনের ফল,মায়ের হাতে তুলে দিলেন। আমাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,তুমি তোমার পড়ার জন্য কোন চিন্তা করোনা।তোমার পড়ার খরচের সব দায়িত্ব আমাদের।তুমি মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করে বড় ডাক্তার হবে,আর তোমার বাবার মতো আদর্শবান ভালো মানুষ হবে।   সেদিন এই কথা শুনার পর মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম। সেদিন বাবার প্রতি আমার কোন অভিমান ছিলনা। গর্ব অনুভব করি। বাবার দুঃখ,কষ্ট আর ভালো মানের মানুষের কথা ভেবে খুব কষ্ট হয়ে ছিল,খুব কেঁদেছিলাম।বুঝেছিলাম,ভালো জামা কাপড় পরলেই ভালো মানুষ হয়না,হওয়া যায় না। আর সেদিন বাবার সেই নোংরা পাঞ্জাবি,পাজামা,শত সেলাই করা চপ্পলের কথা বার বার মনে পরছিল।এদিক ওদিক খুঁজতেই নজরে পড়ল,সেইছেঁড়া চপ্পল,পাজামা পাঞ্জাবী। মা সেগুলি পারিস্কার করে, পরিপাটি ভাঁজ করে ঠাকুরের বেদির পাশে রেখে দিয়েছেন। এই দৃশ্য দেখে আর কান্না থামাতে পারলাম না। কান্না ভেজা চোখে সেগুলির দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকলাম।মনে হলো, এগুলোই আমার বাবাকে আদর্শ বাবার তৈরি করেছে।সেদিন এগুলি থেকেই আমি 'বাবা' কথার মানে খুঁজে পেলাম।   চিত্ত রঞ্জন চক্রবর্তী।শিলিগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।