প্রিন্ট এর তারিখঃ 2026-10-03 21:06:38

মুমিনের জীবনে নামায: সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ ও সফলতার চাবিকাঠি, মাওলানা মোতাকাবিবর হোসেন


আরিফুল ইসলাম পাঠান  দুনিয়ার জীবনে একজন মুমিনের সবচেয়ে  বেশি আনন্দের বিষয় কোনটি? দেখা যায়, একেক মানুষ একেক বিষয়ে আনন্দ পেয়ে থাকে। একেকজন একেক বিষয়ে আগ্রহ অনুভব করে। কেউ ভ্রমণে। কেউ ভালো কোনো খাবারে। কেউ গল্প-আড্ডায়। কেউ বই পড়ায়। কেউবা ছোট-বড় আরো নানা কাজে। এই তালিকায় জীবনধারণের জন্য আবশ্যকীয় পর্যায়ের বিষয় যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষয়ও। কোনো ধরনের কোনো লাভ-ক্ষতি নেই- এমন বিষয় যেমন আছে, তেমনি আছে অনর্থ অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ও। জীবন ধারণের জন্য খাদ্যকে সবচেয়ে  বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এই খাদ্যে পুরো দুনিয়ার মানুষের পছন্দ-অপছন্দে কত পার্থক্য! প্রত্যেকের আগ্রহে-অনাগ্রহে কত তফাত! একই মায়ের সন্তান, একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই ঘরে বসবাস। এরপরও দুজনের দুই খাবারে আগ্রহ। ভিন্ন ভিন্ন দুই বিষয়ে দুজনের আনন্দ। এই পার্থক্যগুলো হয় কখনো ব্যক্তিগত কারণে। কখনো পারিবারিক কারণে। কখনোবা সাথী-সঙ্গী কিংবা পরিবেশগত কারণে। সেই সূত্রেই কারো আগ্রহ ও আনন্দের বিষয় হয়ে থাকে পড়াশোনা। কারো লেখালেখি। কারো নামায, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দান সদকা! নামাযের গুরুত্ব মুমিন হিসেবে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের, আনন্দের ও তৃপ্তির বিষয় কী হওয়া উচিত? প্রথমত অবশ্যই ভালো কিছু হওয়া উচিত। সত্যিকারের কাক্সিক্ষত বিষয় হওয়া উচিত। এরপর সেই ভালো আর কাক্সিক্ষত হাজার বিষয়ের মধ্যে কোন্টি তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা জানার জন্য উচিত কুরআন ও হাদীসের শরণাপন্ন হওয়া। কুরআনে মুমিন-মুত্তাকীর পরিচয় দিতে গিয়ে ঈমানের পরেই বলা হয়েছে নামাযের কথা। ইরশাদ হয়েছে- الَّذِیْنَ یُؤْمِنُوْنَ بِالْغَیْبِ وَ یُقِیْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ. মুত্তাকী তারা,) যারা গাইবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা কিছু দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে) ব্যয় করে। -সূরা বাকারা (২) : ৩ লক্ষ করার মতো বিষয় হল, আল্লাহ তাআলা ঈমান শিক্ষা দেওয়ার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওহী পাঠিয়েছেন। আর নামাযের বিধান দিয়েছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঊর্ধ্বালোকে নিয়ে। সাত আসমান পার করে আল্লাহর কাছে নিয়ে এই মহান গুরুত্বপূর্ণ উপহার ও ইবাদত দান করেছেন। অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। সুতরাং এই ইবাদত যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি সেই ইবাদতেই মুমিনের বিরাট সফলতা নিহিত। সেজন্য কুরআন মাজীদে সফল মুমিনের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই বলা হয়েছে- الَّذِیْنَ هُمْ فِیْ صَلَاتِهِمْ خٰشِعُوْنَ. যারা নামাযে বিনয়াবনত। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ২ এরপর আরো কয়েকটি গুণ উল্লেখ করে শেষে আবার বলা হয়েছে- وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَلٰی صَلَوٰتِهِمْ یُحَافِظُوْنَ. যারা নামাযের ব্যাপারে যত্নশীল। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ৯ আরেক জায়গায় আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাব ও মেযাজ প্রসঙ্গে  প্রথমে বলেছেন- اِنَّ الْاِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوْعًا، اِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوْعًا، وَّ اِذَا مَسَّهُ الْخَیْرُ مَنُوْعًا، اِلَّا الْمُصَلِّیْنَ،الَّذِیْنَ هُمْ عَلٰی صَلَاتِهِمْ دَآىِٕمُوْنَ. বস্তুত মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে লঘুচিত্তরূপে। যখন তাকে কোনো কষ্ট স্পর্শ করে, সে অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়ে। আর যখন  তাকে স্বচ্ছন্দ স্পর্শ করে তখন সে হয়ে পড়ে অতি কৃপণ। তবে নামাযী ব্যক্তিরা ছাড়া। যারা তাদের নামায আদায় করে নিয়মিত। -সূরা মাআরিজ (৭০) : ১৯-২৩ এখানে মানুষের সৃষ্টিগত দুর্বলতা ছাড়িয়ে অর্জনীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গে প্রথমেই বলেছেন নামাযের কথা। এরপর বেশ কয়েকটি গুণ উল্লেখ করার পর আবার বলেছেন- وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَلٰی صَلَاتِهِمْ یُحَافِظُوْنَ، اُولٰٓىِٕكَ فِیْ جَنّٰتٍ مُّكْرَمُوْنَ . নামাজ পড়লে যে ফল পাবেন, নামাযের ফায়দা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَ اَقِمِ الصَّلٰوةَ طَرَفَیِ النَّهَارِ وَ زُلَفًا مِّنَ الَّیْلِ اِنَّ الْحَسَنٰتِ یُذْهِبْنَ السَّیِّاٰتِ ذٰلِكَ ذِكْرٰی لِلذّٰكِرِیْنَ. দিনের উভয় প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে নামায কায়েম করো। নিশ্চয়ই পুণ্যরাজি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে তাদের জন্য এটা এক উপদেশ। -সূরা হুদ (১১) : ১১৪ এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, নামায বহু পাপ মিটিয়ে দেয়। আরো ইরশাদ করেছেন- وَ اَقِمِ الصَّلٰوةَ   اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰی عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ. এবং নামায কায়েম করো। নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। -সূরা আনকাবূত (২৯) : ৪৫ অর্থাৎ নামায আদায় করতে থাকলে একসময় এই নামাযই মানুষকে অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। এছাড়া আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য প্রার্থনার জন্য নামাযকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন- وَ اسْتَعِیْنُوْا بِالصَّبْرِ وَ الصَّلٰوةِ وَ اِنَّهَا لَكَبِیْرَةٌ اِلَّا عَلَی الْخٰشِعِیْنَ. তোমরা সবর ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় সালাতকে কঠিন মনে হয়; কিন্তু তাদের পক্ষে নয়, যারা খুশূ (অর্থাৎ বিনয় ও মনোযোগ)-এর সাথে আদায় করে। -সূরা বাকারা (২) : ৪৫ এখানে ধৈর্য ও নামাযের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্যের দৃঢ় আশ্বাস পাওয়া যায়। নামাযে অবহেলা কুরআন মাজীদে নামাযীদের যেমন প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি নামাযে অবহেলাকারীদের প্রতি ধমকি ও হুঁশিয়ারীমূলক বক্তব্যও এসেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- فَوَیْلٌ لِّلْمُصَلِّیْنَ،الَّذِیْنَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُوْنَ. ধ্বংস রয়েছে সেই নামাযীদের জন্য, যারা তাদের নামাযে গাফলতি করে। -সূরা মাঊন (১০৭) : ৪-৫ এমনকি অলসতার সাথে নামায আদায়কে মুনাফিকদের পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন- وَ اِذَا قَامُوْۤا اِلَی الصَّلٰوةِ قَامُوْا كُسَالٰی. তারা যখন নামাযে  দাঁড়ায় অলসতার সাথে দাঁড়ায়। -সূরা নিসা (৪) : ১৪২