মতামত
রাষ্ট্র কি শুধু ইতিহাস নিয়েই বাঁচবে, নাকি ভবিষ্যৎও নির্মাণ করবে?
একটি জাতি শুধু ইতিহাসকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না; তাকে ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে হয়। ইতিহাস আমাদের পরিচয় দেয়, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়। কিন্তু কোনো জাতি যদি প্রতিদিন শুধু অতীত নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তবে একসময় সে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ইতিহাস সম্মানের, কিন্তু উন্নয়ন নির্মিত হয় বর্তমানের সঠিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ওপর। চীনের শেনজেন আজ বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি নগরী। অথচ মাত্র চার দশক আগে এটি ছিল একটি ছোট জেলেপাড়া। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে আজ প্রযুক্তি, শিক্ষা ও শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। সিঙ্গাপুরের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; কিন্তু সুশাসন, দক্ষ নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে—উন্নয়নের জন্য সম্পদের চেয়ে সঠিক নীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশগুলো ইতিহাস ভুলে যায়নি। কিন্তু তারা ইতিহাসকে ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে দেয়নি। তারা অতীতকে স্মরণ করেছে, আর ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশও একদিন এমন স্বপ্ন দেখেছিল। আজও সেই স্বপ্ন বেঁচে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কী? আমরা কি বিজ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, নাকি এখনো রাজনৈতিক বিভাজন, স্লোগান, মিছিল এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি? রাষ্ট্রের শক্তি তার বক্তৃতায় নয়; তার প্রতিষ্ঠানে। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় আদালতের স্বাধীনতায়, প্রশাসনের জবাবদিহিতে, নাগরিক সেবার মানে, শিক্ষার গুণগত উন্নতিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। যদি জুলাইয়ের ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়ে থাকেন এবং আরও অনেকে গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন—যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—তাহলে নাগরিক হিসেবে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক: এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনে কী অগ্রগতি হয়েছে? দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের প্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে? এমন বড় ঘটনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। একইভাবে, এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক কাজেরও গুরুত্ব রয়েছে। একটি ডকুমেন্টারি শুধু কিছু ভিডিওচিত্রের সমষ্টি নয়। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, নথিপত্র, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। ইতিহাসের দলিল তৈরির দায়িত্ব হালকাভাবে নেওয়া যায় না। আরেকটি প্রশ্ন আমাকে দীর্ঘদিন ভাবায়—দেশে এত মিটিং-মিছিলের প্রকৃত অর্জন কী? গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, সেই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবন, কর্মঘণ্টা ও অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলছে। যদি একটি কর্মসূচির ফলে মানুষের দুর্ভোগই বেশি বাড়ে, তবে তার কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা যেমন অধিকার, তেমনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমি বরাবরই দলীয় ছাত্র রাজনীতির সমালোচক। এটি একটি নীতিগত অবস্থান, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষার্থীদের সময়, মেধা ও শক্তি ব্যয় হওয়া উচিত গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সাহিত্য এবং দক্ষতা অর্জনে। রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যেন এমন হয়, যেখানে মতের ভিন্নতা সহিংসতার নয়, যুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রকে বুঝতে চাইলে সংসদের দিকে তাকানোর পাশাপাশি রাস্তায়ও তাকাতে হয়। সেই রাস্তায় দেখা যায়—একজন রিকশাচালক সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করছেন। তিনি হয়তো দেশের জিডিপি, বৈদেশিক ঋণ বা ব্যাংকিং খাতের জটিল পরিসংখ্যান জানেন না। কিন্তু তিনি জানেন, আজ কাজ না করলে আজ তাঁর পরিবারের খাবার জুটবে না। উন্নয়নের সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে এই মানুষটির জীবনমান থাকা উচিত। আমিও একজন সাধারণ নাগরিক। আমার অভিজ্ঞতাও খুব আলাদা নয়। গত দুই মাস ধরে আমার বাসায় গ্যাসের সংযোগ নেই। তবুও নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের চুলায় রান্না করায় বিদ্যুৎ বিলও বেড়ে গেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়; এটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক—নাগরিক সেবার মান কতটা কার্যকর? একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সফলতা কেবল বড় প্রকল্পে নয়; বরং একজন সাধারণ নাগরিক সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিতেও। নেতৃত্বের বিষয়েও কিছু কথা বলা জরুরি। নেতৃত্ব কেবল একটি পদ নয়; এটি একটি দায়িত্ব। ইতিহাসে যেসব নেতা মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারা সংকটের সময় মানুষের পাশে থেকেছেন। আবার ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে, কোনো নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা, সময় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব বড় নয়। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, একজন শ্রমিক সম্মানজনক মজুরি পাবেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদ ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবেন, একজন উদ্যোক্তা হয়রানির শিকার হবেন না, একজন রোগী ন্যায্য চিকিৎসা পাবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়বেন না। পরিবর্তন শুধু সরকার পরিবর্তনের নাম নয়। পরিবর্তন মানে নাগরিকের জীবন সহজ হওয়া। পরিবর্তন মানে দুর্নীতি কমা, সেবার মান বাড়া, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা। শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই? একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিদিন অতীতের দ্বন্দ্বই আলোচনার বিষয় হবে, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আগামী প্রজন্ম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে? আমার বিশ্বাস, এই দেশের মানুষ বিলাসিতা চায় না। তারা চায় ন্যায্য সেবা, আইনের সমান প্রয়োগ, সুশাসন, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার স্লোগানে নয়, তার প্রতিষ্ঠানে। একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তার অতীতের গৌরবে নয়, তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতায়। ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেবে, কিন্তু আগামী প্রজন্ম আমাদের বিচার করবে—আমরা তাদের জন্য কেমন রাষ্ট্র রেখে গেলাম। মোঃ মনির হোসেন গ্রন্থাগারিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক
মাদকের নীরব আগ্রাসন: জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সংকট
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নানা আলোচনার আড়ালে একটি ভয়ংকর সংকট ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে—মাদকের বিস্তার। ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ফেন্সিডিল, হেরোইন ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা আজ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির বিস্তার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেখানে একজন আসক্তের বক্তব্য—"ইয়াবা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়"—আসলে কেবল একজন ব্যক্তির হতাশা নয়, বরং একটি সমাজের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে, তখন সেটি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের জন্যও আত্মসমালোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে ওঠে। ইয়াবা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। এটি মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিকভাবে উদ্দীপিত করে সাময়িক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অনিদ্রা, বিষণ্নতা, সাইকোসিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং স্থায়ী মানসিক বিকারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তি নিজের আচরণ, আবেগ এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে কিছু পার্থক্য থাকলেও এটি স্পষ্ট যে সমস্যাটি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ এবং এমনকি নারী ও কিশোর-কিশোরীরাও এই মাদকের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। এটি দেশের জনমিতিক সুবিধাকে (Demographic Dividend) দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেই রুট ব্যবহার করে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়েও বিভিন্ন ধরনের মাদক চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অতীতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল অভিযান ও গ্রেপ্তার দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি। কারণ মাদকের সরবরাহের পাশাপাশি এর চাহিদাও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। আসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ পান না। মাদকের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম ভয়াবহ নয়। উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত ব্যয়, অপরাধ বৃদ্ধি, বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ এবং পরিবারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সব মিলিয়ে এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝা সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে মাদক পাচারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ, অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করতে হবে। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। আধুনিক কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে অনেক আসক্তকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর গোপনীয় হেল্পলাইন, অনলাইন কাউন্সেলিং এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাদককে কেবল অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না; এটিকে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তরুণ প্রজন্ম। তাদের মাদকাসক্তির অন্ধকার থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জাতীয় নিরাপত্তা এবং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সফল হতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বস্তরের নাগরিক অংশগ্রহণ—এই তিনটির সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি হলো সমাজ বদলের ইঞ্জিন
সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ ছাএ রাজনীতি দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের প্রধান প্রত্যাশা। ক্যাম্পাস গুলোতে দখল দারিত্ব, হানাহানি ও শক্তির প্রদর্শনের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে সুস্থ সহাবস্থান এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের রাজনীতি গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। রাজনীতি বলতে আমরা কি বুঝি ? রাষ্ট্রের বা সরকারের বা জনগণের বিভিন্ন সমস্যা, সুযোগ - সুবিধা, ভালো - মন্দ নিয়ে কথা বলা বা সমলোচনা করা কি রাজনীতি নয় ? বর্তমানে দেশের অস্থিতিশীলতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কথা বলা কি রাজনীতি নয় ? তাহলে রাজনীতি কি শুধু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং না করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ? নাকি চাঁদাবাজি, হল দখল, জমি দখল, খাল দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এই সব হল রাজনীতি। ছাএ রাজনীতির আদর্শগত ভিত্তি হতে হবে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণের প্রতি নিবেদিত। এ ক্ষেত্রে ছাএ রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক উন্নয়ন। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের রাজনীতি অবশ্যই সুশৃঙ্খল ও শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং তাদের নেতৃত্ব গুন বিকাশিত হয়। তবে বলপ্রয়োগ বা সংঘাতের রাজনীতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে। ছাএ রাজনীতি হচ্ছে দেশের গনতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম মূল্যবান ভিত্তি। ছাএ রাজনীতি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সচেতনতা, অধিকার সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ইতিহাসে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গনতান্ত্রিক সংগ্রামে ছাএ সমাজ কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্ব বা অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। সুস্থ আর সুন্দর ছাএ রাজনীতি শিক্ষার্থীদের যুক্তি, সংগঠিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠ দিয়ে কথা বলার সাহস জোগায়, তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন ছাএ রাজনীতি আদর্শচ্যুত হয়ে দলীয় স্বার্থ, সহিংসতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। তাতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি ও মূল আলোচনা ছাএ রাজনীতি নিয়ে কিন্তু আমার মতে, ছাএ রাজনীতি পৃথক কোন বিষয় নয়। এর সাথে শিক্ষক রাজনীতি, বিভিন্ন পেশাজীবীদের রাজনীতি, শ্রমজীবী সংগঠনের বিষয় গুলো সম্পৃক্ত। কোনটিকে অন্যটির থেকে পৃথক করে দেখার অবকাশ নেই। দলীয় লেজুরভিত্তি ছাএ সংগঠন বা শিক্ষক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী সংগঠনের বিরোধিতা আমি ও করি কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলতে চাই যে, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অপরীসিম। প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্কের অধিকার রয়েছে এবং উচিত ও প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং সে আলোকে নিজের মতামত প্রদান করা। কোন আইন করে নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠী বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না সে গোষ্ঠী বা সংগঠন আদর্শগত ভাবে হিংসাত্মক বা ধ্বংসাত্মক কাজে যুক্ত থাকে।
উন্নয়নের গতিপথে বিকেন্দ্রীকরণের অপরিহার্যতা
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রমকে কার্যকর, জনবান্ধব ও টেকসই করতে প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন ও সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। নাগরিকদের জন্য প্রদেয় জনসেবার মান উন্নয়ন, সেবাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা—এসব লক্ষ্য অর্জনে একটি দক্ষ ও বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো মূলত কেন্দ্রনির্ভর, যা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রণীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা কিংবা স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর প্রায় সবই কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন—সবকিছুই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড একটি অতিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় বাস্তবতা, বৈচিত্র্য ও চাহিদার যথাযথ প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। অতিকেন্দ্রীকরণের এই প্রবণতা কেবল উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি ও কার্যকারিতাকেই ব্যাহত করছে না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের ক্ষেত্রেও অন্তরায় সৃষ্টি করছে। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয়ের অপচয় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তাই উন্নয়নকে গণমুখী ও বাস্তবমুখী করতে হলে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নীতিগত বক্তব্য, প্রস্তাব এবং আংশিক উদ্যোগ দেখা গেলেও কার্যকর ও টেকসই কোনো কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে উপজেলা পরিষদ গঠনের উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রবণতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা পায়নি। ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। বিকেন্দ্রীকরণ মানে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সেবাদানের ক্ষেত্রে বাস্তব ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট প্রণয়ন, কর আহরণ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না করা হলে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিমালা ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি কাঠামো। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার বিকাশ ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান। এসব অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো কমিশন গঠন বা আনুষ্ঠানিকতা সৃষ্টির চেয়ে অধিক জরুরি হলো—বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ। নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব উদ্যোগে রূপান্তর করতে পারলেই কেবল বিকেন্দ্রীকরণের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। অবশেষে বলা যায়, উন্নয়নকে যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং জনগণমুখী করতে হয়, তবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ আর কোনো বিকল্পহীন ধারণা নয়—এটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা। কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই কেবল একটি শক্তিশালী ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়—নতুন সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং বাস্তব পদক্ষেপ নিতে কতটা আন্তরিকতা প্রদর্শন করে। লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা
নারী ও শিশু নির্যাতন: বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা - নিকোলাস বিশ্বাস নারী ও শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা অপরাধের পরিসংখ্যানগত হিসাব নয়; এটি একটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে সামনে আসছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধগুলো আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক - সবক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধ অহরহ ঘটছে। অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুর্বল মানুষদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। আমাদের সমাজে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত কারণে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা প্রায়ই তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কেবল ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও প্রবণতা বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি ২০২৬ সালেও অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দেশে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, সম্মুখসারিতে কাজ করা মানবসেবা ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর তীব্র অর্থসংকট এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কয়েক দশকের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত হয়রানি ও হুমকির মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক আন্দোলনকারী ও পরিচিত ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের প্রতি 'শূন্য-সহনশীলতা' নীতি কার্যকর করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে। দেশের বর্তমান বাস্তবতা ও চিত্র বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে - যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর গত নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা অথবা যৌন নির্যাতনের পর করুণ পরিণতি হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়াও সংগৃহীত উপাত্তসমূহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে: ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয় এবং দেশের ৪৭.২ শতাংশ কিশোরীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বাল্যবিবাহ হয়ে যায়। এছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশে ১০২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং '১০৯ ও ১০৯২১' জাতীয় হেল্পলাইনের মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে চরম দুর্বলতা রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নথিভুক্ত হওয়া ৫,৬০০টিরও বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলায় আসামির শাস্তি বা রায় কার্যকর হয়েছে। জরুরি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশকে অতিসত্বর একটি ডেডিকেটেড 'শিশু বিষয়ক বিভাগ' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংস্কার করতে হবে এবং পেশাদার ও সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কর্মী দল গঠন করতে হবে। সেই সাথে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বিত একটি কার্যকরী কর্মগোষ্ঠী গঠন করা প্রয়োজন, যা সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের মাধ্যমে অরক্ষিত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দেবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে একটি স্থায়ী সুরক্ষা বলয়ে রূপান্তর করবে। তবে এ তথ্যগুলো মূল ঘটনার একটি অংশমাত্র। সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক চাপের কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে পারেন না এবং আদালতের বাইরে আপস করতে বাধ্য হন। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মানসিক প্রভাব প্রযুক্তির বিকাশ অপরাধের ধরণ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন সবার হাতে থাকায় যেকোনো নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতীতেও সহিংসতা হতো, কিন্তু প্রযুক্তি অপ্রতুল থাকায় এত দ্রুত তা সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারতো না। সামাজিক মাধ্যমে নির্যাতনের বিষয় ছড়ানোর দুটি দিক রয়েছে: ক) ইতিবাচক প্রভাব: অন্যায়ের ভিডিও বা ছবি জনমত গঠন করতে সাহায্য করে, অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। খ) নেতিবাচক প্রভাব: সহিংসতার ভয়াবহ দৃশ্য বারবার দেখার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। নারী ও শিশুদের ওপর এই মানসিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়। কোনো মা যখন একটি শিশুর ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখেন, তখন নিজ সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তার মনে স্থায়ী শঙ্কা তৈরি হয়। একইভাবে, প্রকাশ্যে কোনো নারীকে লাঞ্ছিত হতে দেখলে অন্য নারীদের মনে ভয় জন্মায় এবং তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সংকুচিত করতে পারেন। এভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও প্রযুক্তি মারফতে পুরো সমাজে এক যৌথ মানসিক আঘাত ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া প্রযুক্তির অসচেতন ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন না রাখা, সংবেদনশীল ছবি বারবার পোস্ট করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার দ্বিতীয়বার সামাজিকভাবে হেনস্থা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন। প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম; তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। রাজনৈতিক সংঘাত ও পারিবারিক সহিংসতা দলীয় সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গণতান্ত্রিক চর্চায় মতাদর্শিক ভিন্নতা স্বাভাবিক, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ কোনো ব্যক্তির ওপর অমানবিক অত্যাচারকে সমর্থন করতে পারে না। গণপিটুনি, শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্যে অপমান ও নৃশংসতা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে। ক্ষমতা প্রদর্শন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতাকে যখন নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। একসময় মানুষের এই কষ্ট দেখে সমাজ উদাসীন হয়ে পড়ে, যা একটি অসুস্থ সামাজিক ব্যবস্থার লক্ষণ। একইভাবে, পারিবারিক সহিংসতা একটি মারাত্মক কিন্তু গোপনীয় সমস্যা। পরিবার ও সমাজ প্রায়ই একে 'ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়' বলে এড়িয়ে যায়। স্ত্রীর ওপর নির্যাতন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা এবং বয়োবৃদ্ধ বা দুর্বলদের অপমান করা গুরুতর অপরাধ হলেও সম্মানহানি ও সংসার টিকিয়ে রাখার চাপে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। এই নীরবতা অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে। তাই পরিবার ও সমাজকে এ নীরবতা ভেঙে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সমাধানের মূল পথ ও করণীয় নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে শুধু আইন সংশোধন বা আলোচনার আয়োজন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও বহুমুখী পদক্ষেপ: ১. কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ: রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস নষ্ট করে। ২. নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে যে শক্তি কখনো অন্যকে নিপীড়নের অধিকার দেয় না। মেয়েদেরও তাদের অধিকার, আত্মরক্ষা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ৩. ভিকটিম দোষারোপ বন্ধ করা: সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপরাধীর ওপর থেকে দায় সরানোর মানসিকতা বাদ দিতে হবে। অপরাধের সমস্ত দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর; তবে ভুক্তভোগী সহানুভূতি ও আইনি সমর্থন পাওয়ার যোগ্য। ৪. গণমাধ্যম ও রাজনীতির দায়িত্ব: গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীল পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মেনে চলতে হবে এবং কোনো অপরাধীকে দলীয় আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সম্মিলিত দায়িত্ব ও উপসংহার একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার বড় বড় অট্টালিকা, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাজ, নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা অপরাধকে সমর্থন করার নামান্তর। আজ যে ঘটনা অন্যের পরিবারে ঘটছে, তা আগামীকাল আমাদের নিজেদের ঘরেও ঘটতে পারে। আমাদের এমন এক সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে নারীরা ঘরে ও বাইরে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং শিশুরা ভয়হীন পরিবেশে বড় হবে। কোনো মতপার্থক্যই সহিংসতাকে বৈধ করতে পারে না। নীরবতা ভেঙে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। (নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-UNFPA মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণঃ এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে সর্বমোট ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) রয়েছে। স্তরভিত্তিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুমানিক সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো: মাধ্যমিক বিদ্যালয় (হাই স্কুল): সারা দেশে প্রায় ১৯,৭৫৭টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ (উভয় স্তর): প্রায় ১,৩৮২টি। উচ্চমাধ্যমিক কলেজ: ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ২,৬৬৪টি। মাদ্রাসা: প্রায় ৯,২৬৫টি। কারিগরি ও ভোকেশনাল: প্রায় ২,২২৫টি। শিক্ষাখাতের সঠিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও সামগ্রিক ডাটাবেজ তৈরি করতে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ ও নিবন্ধন হালনাগাদ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে অর্ডার)। ব্যানবেইসের (BANBEIS) বাৎসরিক প্রতিবেদনে এসব বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কে? এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) শিক্ষক যারা সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন-ভাতা পান। “এমপিও” (MPO) এর পূর্ণরূপ হলো “মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার” (Monthly Payment Order), যা দ্বারা এই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পান। বাংলাদেশে শিক্ষার ৯৩ শতাংশই বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে,দীর্ঘমাসাধিককাল সময় ধরে ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মানুষের কাতারেই পড়েন না! তাদের দাবিদাওয়া বলতে কিছুই নেই বা থাকতে পারে না। অথচ আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষা বলতেই বুঝায় বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা। সরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। অন্যদিকে, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। স্বল্প বেতনে বাড়ি হতে অনেক দূরে গিয়ে তাদের চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা না থাকা এমন মানুষদের চাকরি এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরপুর। তাই এমপিও সিস্টেম রাখাটা কতোটুকু যুক্তিসংগত তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একটি হিসেবে দেখা যায়- যদি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নেয় তাহলে সরকারের লাভ বেশী হতো। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন স্কেলের শতভাগ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এছাড়াও আছে বাড়ি ভাড়া আর সামান্য মেডিক্যাল ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা। আমরা বেসরকারি শিক্ষকগণ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পর জাতীয়করণের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিশৃঙ্খলার বদনামতো আছেই। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যত্রতত্র অর্থ আদায়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি ব্যবসায়িক পণ্য পরিণত হয়েছে। জাতীয়করণ হলে শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগর শিক্ষকগণ লাভবান হবে না শুধু জাতিও লাভবান হবে। তারা তাদের দোরগোড়ায় পছন্দের সরকারি স্কুল-কলেজ পাবে সাথে তাদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে। ছাত্রছাত্রীদের হতে আদায়কৃত অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রিয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিলে এটাই হবে জাতীয়করণের সহজ সরল কাজ। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অথচ একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই অ্যাকাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে এক বড় ধরনের বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন স্কেলের একধাপ নিচে দেওয়া হয়। তাছাড়া উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারি প্রধানদের বেতন স্কেল সমান হওয়ায় সহকারি প্রধান মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ভাতা এখনো সরকারি অনুদান থেকে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের বেতন ভাতা কখন ছাড় হবে তা জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বেতনের খবর এক তারিখের মধ্যে প্রচারিত হলেও ব্যাংকে জমা হতে মাসের ১০/১২ তারিখ চলে যায়। তারপরে পরিচালনা পর্ষদ সভাপতির দস্তখতসহ বেতন বিল তৈরি করে ব্যাংকে জমা দিতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যায়। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের পকেটে বেতনের টাকা আসতে মাসের বিশ তারিখ হয়ে যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শিক্ষা বিতরণের মহান কারিগরদের বেতন এখনো অনুদান সহায়তা- এটা তাদের জীবনে এক ধরনের ‘চলিতেছে সার্কাসে’র মতো। বেসরকারি শিক্ষকরা এমনিতেই এমপিও সিস্টেমের জটিল নিয়মের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন শিক্ষক ইচ্ছা মতো তাদের পছন্দের বাড়ির কাছের প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে পারছেন না। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী টাকা পাওয়ার আগেই অর্থাভাবে বিনাচিকৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে কোনও ধরনের সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কাটা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। ১৯৭৩ সালে একটি যুদ্ধবিধস্ত দেশে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমকি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। ১৯১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় । এ অবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থে দ্রুত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বিনিয়োগে ইউনেস্কো আইএলও’র সুপারিশগুলো বাস্তবায়নসহ সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা জাতীয়করণ প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পাঠ্যক্রম, আইন এবং একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বেতনের ১০ হারে কেটে রাখলেও বৃদ্ধ বয়সে যথাসময়ে এ টাকা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা: তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন,আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশ নেত্রী, আপোষহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ওয়াদা করেছিলেন ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যার ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ওয়াদা করেছিলেন বি এন পি রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেলে প্রথম কাজ হবে দেশের এম পি ও ভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জীবন মানের উন্নয়ন করার জন্য চাকরি জাতীয়করণ করা হলে। দীর্ঘদিন আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সমস্যাটি মানবিক কারণে সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করুন। আপনার মানবিক দয়ালু হস্তক্ষেপেই পাঁচ লাখ জীবন স্বাচ্ছন্দময় হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষকদের শ্রম ও মেধার মূল্যায়ন করা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
পে-স্কেল : বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী?
বেসরকারি খাতে কোনো নির্দিষ্ট 'জাতীয় পে স্কেল' নেই, তাই সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পে স্কেল শুরুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা ইতিহাস নেই। মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নীতি, কাজের ধরন, সক্ষমতা এবং বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল তৈরি ও বাস্তবায়ন করে থাকে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যই সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল বা পে-স্কেল চালু রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই সর্বপ্রথম সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়। এবার, দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হতে পারে– এই খবরে বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? সরকারি দফতরে আনন্দের হাওয়া, ঠিক তখনই দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এই মহোৎসবের বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? নতুন পে-স্কেলের আলো কি কোনোভাবেই পৌঁছাবে বেসরকারি খাতে? নাকি তারা পাবেন শুধু নতুন করে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির? বিভন্ন তথ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সংশোধিত মূল বেতনের একটি অংশ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির আশা করা হলেও, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরে রাখা বেসরকারি খাতের কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে: শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও গণমাধ্যমসহ অর্থনীতির সব প্রধান চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের জন্য একটি খসড়া ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি–সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, উৎসব ভাতা ও সার্বিক শ্রমবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হলেও বেসরকারি খাতের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার রূপরেখা এই মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রম নীতিমালা সংস্কারের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে। পে-স্কেল: সচিব কমিটির সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হলো সরকারি পে-স্কেল সরাসরি বেসরকারি খাতের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে সরকারি বেতন বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। গত পে-স্কেলগুলোতে সরকারি কাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি খাতে যে সুবিধাগুলো সাধারণত প্রসারিত হয়েছে: মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: সরকারি কাঠামোতে মূল বেতন বাড়ার কারণে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং প্রারম্ভিক মূল বেতন সমন্বয় করতে বাধ্য হয়। ভাতা সমন্বয়: সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও কর্মীদের জন্য এই ভাতাগুলো বাড়িয়ে থাকে। বোনাস ও প্রণোদনা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব বোনাস ও বিশেষ সুবিধার প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতেও। এমপিওভুক্ত শিক্ষক: সরকারি পে-স্কেলের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও গ্র্যাচুইটি: নতুন পে-স্কেলে সরকারি পেনশনের হার ও গ্র্যাচুইটি বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং টার্মিনেশন বেনিফিট পাওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে পারেন। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও কী সুবিধা বর্তমানে কার্যকর নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ সুবিধা বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেতে পারেন এটাই সবার প্রত্যাশা। একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : নতুন অধ্যয়ের সুচনা
চীন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। বাংলাদেশ—চীন সম্পর্ক প্রাচীন ও প্রায় তিন হাজার বৎসরের পুরোনো। বাঙালি সভ্যতা ও চীনা সভ্যতার মাঝে খ্রিষ্টের জন্মেরও হাজার বৎসর আগে থেকে যোগাযোগ আছে। প্রাচীনকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে চীন এবং বাংলায় মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশর আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের এক অন্যতম অংশীদার চীন এবং বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক পক্ষ। সম্প্রতি ২০১৭ সালেপ্রধানমন্ত্রীর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ২ জানুয়ারি প্রথম বিদেশ সফর ছিল চীনে। ২০০২ সালে জোট সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া চীন সফর করেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির সঙ্গে দেখা করেন এবং এক চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানান। চীন সফর কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন : প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অতীতে ভারত কেন্দ্রিক প্রাধান্য থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্র নীতিতে একে কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করেন তারা। কারণ চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান অংশ চীনকেন্দ্রিক। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে চীন সফর জরুরি ছিল বলে মনে করেন কূটনীতিকরা চীন সফর কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অতীতে ভারত কেন্দ্রিক প্রাধান্য থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্র নীতিতে একে কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করেন তারা। কারণ চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান অংশ চীনকেন্দ্রিক। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে চীন সফর জরুরি ছিল বলে মন হয়। বিএনপি সরকারের সঙ্গে অতীতে চীনের সম্পর্কে কয়েকবার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিএনপি কয়েক বছর আগে থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা চীনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার একটা কৌশল নেয়। অতীতে তাইওয়ান ঘিরে ঢাকার অবস্থান বিএনপি সরকারকে বিপাকে ফেলে দেয়। আবার ২০২১ সালে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ঘিরে বিএনপি বিবৃতি দেয়। সেটি নিয়েও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিরোধ ঘটে। তবে এবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে ‘এক চীন নীতি’-কে স্বীকৃতি দেয়। সেটি সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলগত অবস্থান। যৌথ ঘোষণাতেও দুই দেশ একে অপরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। ‘সরকার ঐ সময় একটা ভুল করে বসেছিল, কিন্তু সেই ভুল থেকে তারা দ্রুত বেরিয়েও এসেছে। আর সেই ভুলটাকে মনে করিয়ে দেওয়াতে চীনেরও কোনও স্বার্থ নেই। চীনের স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোতে। আর বাংলাদেশ যেহেতু ঐ অবস্থান থেকে সরেই এসেছে, এ বিষয়ে তাদের আর চাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। এখন আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যাতে ভবিষ্যতে আবার একই রকম ভুল না করি। একই ভুল আবার যেন করে না বসি।’ চীন সফরে প্রাপ্তি প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের চীন সফরে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চুক্তিগুলো সই হয়। মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা এমওইউ সই হয়েছে। তার মধ্যে ১৩টি বাংলাদেশ এবং চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের বিভিন্ন গভর্নমেন্টের মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি সই হয়েছে। আর তিনটি হয়েছে বাংলাদেশের বিডার সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের এবং একটা সই হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি অর্থাৎ দুটি দেশের বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন - গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। এছাড়া টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটি পৃথক এমওইউ এবং বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল রফতানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যৌথ ইশতেহারে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ-চীন একটি যৌথ ইশতেহার তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পক্ষ বিশ্বাস করে চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের সুযোগ বয়ে আনবে। নতুন যুগে দুই দেশ ও দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনতে উভয়পক্ষ তাদের ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ বা ‘সামগ্রিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে’ আরও এগিয়ে নিয়ে যৌথভাবে ‘চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভাগ্যের কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে। উভয়পক্ষ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারা বজায় রাখতে, শাসন পরিচালন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়াতে এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপের ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। এ ছাড়া কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ব্যবস্থার পথ খোঁজার বিষয়েও উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। শিক্ষা জনশক্তি উন্নয়নে, সামাজিক উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি গবেষণায় চীনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছু মিলিয়ে চীনের সঙ্গে আমাদের বহুদিন ধরে যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব; সেই সম্পর্কটাকে আর নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এই সফরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেকে মনে করেন, এই সফরে ১৭টির মতো চুক্তি, প্রটোকল অথবা স্মারক সই হয়েছে এবং সেগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। আমি মনে করি, এই চুক্তিগুলো আমাদের দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে। সেজন্য আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী এই সফরটা অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আমাদের পররাষ্ট্র-সম্পর্কের অগ্রগতির নতুন দুয়ার উন্মোচন হবে, এবং নতুন নতুন ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা এগিয়ে যাবে।’ এটাই সবার প্রত্যাশা। সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকসেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
ডিগ্রীর কারখানায় জ্ঞানের মৃত্যু
আজ শিক্ষক দিবস। কিন্তু এ দিনে শ্রদ্ধার ফুলের চেয়ে বেশি জরুরি প্রশ্ন করা—এই শিক্ষাব্যবস্থায় আসলে আমরা কী উদযাপন করছি? যে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম পাঁচশোর তালিকায় নেই, যে দেশে স্নাতক ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে না, যে দেশে শিক্ষকরা জ্ঞান নয়, প্রশাসনের অনুমোদনে বাঁচেন—সে দেশে শিক্ষক দিবস এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমরা উৎসব করছি, অথচ শিক্ষার মান তলানিতে নেমে গেছে। জ্ঞানের চর্চা হারিয়েছে, কেবল ডিগ্রি বেচাকেনা চলছে। শ্রেণিকক্ষ এখন আর চিন্তার ক্ষেত্র নয়, বরং চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র। শিক্ষক দিবস তাই উদযাপনের নয়, লজ্জা ও প্রতিবাদের দিন। একদিকে শিক্ষানীতির নামে ব্যবসা, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সংঘর্ষে বাঙলাদেশের শিক্ষা আজ নিস্পৃহ, জীর্ণ, পরাজিত এক প্রতিষ্ঠান।