সাতক্ষীরায় ঘের ও জমি জবরদখলের চেষ্টা, সন্ত্রাসী হামলায় ২ যুবক গুরুতর আহত

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা:

সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ থানার ৮ নম্বর ভাড়াশিমলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য আফসার আলী গাজীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জোরপূর্বক অন্যের ভোগদখলীয় জমি ও মৎস্য ঘের জবরদখল এবং দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। গত ৩ জুলাই (২০২৬) ঘটা এই বর্বরোচিত হামলায় জমির প্রকৃত মালিকপক্ষের স্বাধীন হোসেন ও আশানুর নামের দুই যুবক মধ্যযুগীয় কায়দায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর জখম হয়েছেন। বর্তমানে এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

​ঘটনার বিবরণে জানা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার দাদপুর গ্রামের তিন ভাই—হাজী আনিসুর রহমান, নজরুল ইসলাম ও জাফর আলী—২০০৭ সালে কালিগঞ্জ থানার দমদমা মৌজার খতিয়ান নম্বর ১৩৭, দাগ নম্বর ২৫-এর জমিটি এসএ রেকর্ডীয় মালিক কুলসুম বিবির নিকট থেকে ক্রয় করেন। জমির মালিকানা দাবি করে একই বছর আদম আলী গাজীর পুত্র বিএনপি নেতা আফসার গাজী আদালতে মামলা দায়ের করলে ২০১১ সালে আদালত ক্রেতাদের পক্ষে রায় দেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালেও আদালত আফসারের অভিযোগ ভিত্তিহীন ঘোষণা করে পুনরায় ক্রেতাদের পক্ষে রায় প্রদান করেন। রায়ের প্রেক্ষিতে জমির মিউটেশন (নামজারি) ও খাজনা পরিশোধ সম্পন্ন করে মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে জমি ভোগদখল ও মৎস্য চাষ করে আসছিলেন।

​তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পুঁজি করে ভাড়াশিমলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফসার আলী গাজী পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তার ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে অবৈধভাবে জমি জবরদখলের চেষ্টা চালান এবং উল্টো আদালতে ১৪৫ ধারায় মামলা দায়ের করেন। আদালত কালিগঞ্জ থানাকে তদন্তের নির্দেশ দিলে তদন্ত কর্মকর্তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জমিতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু আফসার মেম্বার প্রশাসনের সেই নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে ভাড়াটিয়া বাহিনী নিয়ে ঘেরের প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মাছ লুটে নেন, পাশাপাশি ঘেরের ঘর ভাঙচুর, লুটপাট এবং বেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে আরও প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করেন। সে সময় বাধা দিতে গেলে মালিকদের মারধর ও খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয়, যার সাক্ষী স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম ও লিটন পাড়। এই ঘটনায় কালিগঞ্জ থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করা হয়।

​এই জমি জবরদখলের বিষয়টি নিয়ে গত ২৯ মার্চ জাতীয় দৈনিক "আজকের খবর" এবং ৩০ মার্চ আঞ্চলিক পত্রিকা "দৈনিক পত্রদূত"-এ সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর গত ২০ এপ্রিল (২০২৬) দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন ভুক্তভোগী জমির প্রকৃত মালিকগন। যা ২১ এপ্রিল বিভিন্ন জাতীয় ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর আফসার মেম্বার কিছুদিন নিরব থাকলেও অতি সম্প্রতি তিনি আবারও তার পুরনো জমি দখলের উন্মত্ত নেশায় মেতে ওঠেন।

​সর্বশেষ গত ৩ জুলাই (২০২৬) আফসার আলী গাজী সরকারদলীয় পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জমি দখলের উদ্দেশ্যে তার নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের লেলিয়ে দেন। তারা দা, কোদাল, শাবল ও বাঁশের মতো দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জমির প্রকৃত মালিকপক্ষের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালান। হামলার শিকার হয়ে নজরুল ইসলামের পুত্র স্বাধীন হোসেন এবং তার ভাগিনা আশানুর জীবননাশের আশঙ্কায় গুরুতর জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধার করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসকের সূত্রে জানা যায়, আঘাত আর কিছুটা গভীর হলেই তাদের দুজনেরই জীবননাশের শঙ্কা ছিল।

​তিন দিন চিকিৎসা শেষে গত ৫ জুলাই আক্রান্ত দুই যুবক বাড়ি ফিরলে আফসার গাজীর পক্ষ থেকে নতুন করে হুমকি-ধামকি শুরু হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। থানায় যেন কোনো প্রকার পুলিশি মামলা বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সেজন্য রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি হামলার সময় স্থানীয় মানুষের মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিওচিত্র যেন কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত না হয়, সে ব্যাপারেও কঠোর হুঁশিয়ারি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এলাকায় একের পর এক জমি জবরদখল ও চাঁদাবাজির মামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হয়রানিকারী এই প্রভাবশালী নেতার হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং নিজেদের জমি ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার এবং এলাকাবাসী।